• মঙ্গলবার , ১৪ জুলাই, ২০২৬ | ৩০ আষাঢ়, ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

জামায়াতের ক্ষমতায় আসার সম্ভাবনা দেখছে “আল জাজিরা”

জামায়াতের ক্ষমতায় আসার সম্ভাবনা দেখছে “আল জাজিরা”

অনলাইন ডেস্ক
অনলাইন ডেস্ক

প্রকাশিত: ০১:৫৫ ২১ জানুয়ারী ২০২৬

আগামী ১২ ফেব্রুয়ারি অনুষ্ঠিতব্য সাধারণ নির্বাচনকে ঘিরে বাংলাদেশের রাজনৈতিক অঙ্গনে এক নতুন বাস্তবতা তৈরি হয়েছে। আন্তর্জাতিক গণমাধ্যম আল জাজিরার এক বিশ্লেষণে বলা হয়েছে, বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী এখন তাদের ইতিহাসের সবচেয়ে বড় রাজনৈতিক সুযোগের মুখোমুখি। ২০২৪ সালের আগস্টে ছাত্র–জনতার অভ্যুত্থানের মধ্য দিয়ে শেখ হাসিনা সরকারের পতনের পর এটিই দেশের প্রথম জাতীয় নির্বাচন, যা রাজনীতির গতিপথ নির্ধারণে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।

ড. মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বাধীন অন্তর্বর্তীকালীন সরকার আওয়ামী লীগকে নিষিদ্ধ করায় এবারের নির্বাচন কার্যত একটি দ্বিমুখী প্রতিযোগিতায় রূপ নিয়েছে। আল জাজিরার প্রতিবেদনে বলা হয়, ফ্রন্টরানার হিসেবে থাকা বিএনপির প্রধান প্রতিদ্বন্দ্বী হিসেবে আবির্ভূত হয়েছে জামায়াত, জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি) এবং কয়েকটি ইসলামি দলের সমন্বয়ে গঠিত নতুন একটি জোট। এই জোট নির্বাচনী সমীকরণকে আরও জটিল ও প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ করে তুলেছে।

সাম্প্রতিক জনমত জরিপগুলো জামায়াতের আত্মবিশ্বাসকে উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়িয়েছে। গত ডিসেম্বরে যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক ইন্টারন্যাশনাল রিপাবলিকান ইনস্টিটিউটের (আইআরআই) জরিপে দেখা যায়, বিএনপির জনসমর্থন যেখানে ৩৩ শতাংশ, সেখানে জামায়াত পেয়েছে ২৯ শতাংশ সমর্থন। সর্বশেষ গত সপ্তাহে প্রকাশিত দেশীয় কয়েকটি সংস্থার যৌথ জরিপে ব্যবধান আরও কমে আসে—বিএনপি ৩৪ দশমিক ৭ শতাংশ এবং জামায়াত ৩৩ দশমিক ৬ শতাংশ সমর্থন পেয়েছে বলে উল্লেখ করা হয়।

বিশ্লেষকদের মতে, জামায়াত যদি এই নির্বাচনে জয়ী হতে পারে, তবে তা হবে দলটির জন্য এক চরম নাটকীয় প্রত্যাবর্তন। গত দেড় দশকে দলটি কঠোর দমন-পীড়নের মুখে পড়ে এবং শীর্ষ নেতাদের অনেকেই মানবতাবিরোধী অপরাধের দায়ে ফাঁসি বা দীর্ঘ কারাদণ্ড ভোগ করেছেন। ১৯৪১ সালে সৈয়দ আবুল আলা মওদুদীর প্রতিষ্ঠিত জামায়াত ১৯৭১ সালে মুক্তিযুদ্ধের বিরোধিতা করায় এখনও দেশের একটি বড় অংশের মানুষের মধ্যে বিতর্কিত অবস্থানে রয়েছে। তবে দলটির বর্তমান নেতৃত্ব বলছে, দীর্ঘ সময়ের নিপীড়নই জনগণের মধ্যে তাদের প্রতি সহানুভূতি তৈরি করেছে।

আল জাজিরাকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে জামায়াতের নায়েবে আমির ড. সৈয়দ আব্দুল্লাহ মোহাম্মদ তাহের বলেন, গত ৫৫ বছর ধরে মানুষ আওয়ামী লীগ ও বিএনপির শাসন দেখেছে এবং এখন তারা একটি নতুন রাজনৈতিক শক্তিকে রাষ্ট্রক্ষমতায় দেখতে চায়। তিনি জানান, জামায়াত নিজেকে একটি ‘মধ্যপন্থী ইসলামি শক্তি’ হিসেবে উপস্থাপন করছে। এই কৌশলের অংশ হিসেবে দলটি এবার খুলনায় কৃষ্ণ নন্দী নামে একজন হিন্দু প্রার্থীকে মনোনয়ন দিয়েছে, যা সংখ্যালঘু ভোটারদের আস্থা অর্জনের একটি গুরুত্বপূর্ণ বার্তা হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।

তবে জামায়াতের সম্ভাব্য ক্ষমতায় আসা নিয়ে দেশ-বিদেশে উদ্বেগও রয়েছে। সমালোচকদের আশঙ্কা, ইসলামি দল ক্ষমতায় এলে শরিয়া আইন, নারী অধিকার ও সংখ্যালঘুদের স্বাধীনতা প্রশ্নের মুখে পড়তে পারে। যদিও জামায়াত নেতারা স্পষ্ট করে বলছেন, তারা বিদ্যমান ধর্মনিরপেক্ষ সংবিধানের আওতাতেই সংস্কারমূলক কর্মসূচি বাস্তবায়ন করতে চান।

আন্তর্জাতিক ক্রাইসিস গ্রুপের সিনিয়র কনসালটেন্ট থমাস কিন মনে করেন, জামায়াত ক্ষমতায় এলে ভারতের সঙ্গে সম্পর্ক নতুন চ্যালেঞ্জের মুখে পড়তে পারে, বিশেষ করে বিজেপি সরকারের সঙ্গে আদর্শিক পার্থক্যের কারণে। তবে আগস্টের রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর পাকিস্তানের সঙ্গে বাংলাদেশের সম্পর্ক পুনর্গঠনের যে ইঙ্গিত মিলছে, সেটি জামায়াতের জন্য ইতিবাচক দিক হতে পারে।

এদিকে ১১ দলের নির্বাচনী আসন সমঝোতায় ১৭৯টি আসনে জামায়াত এবং ৩০টি আসনে এনসিপি প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছে। সাংগঠনিক দিক থেকেও জামায়াত বর্তমানে বেশ শক্ত অবস্থানে রয়েছে। তাদের ছাত্র সংগঠন ইসলামী ছাত্রশিবির সাম্প্রতিক সময়ে দেশের বিভিন্ন ক্যাম্পাসের ছাত্র সংসদ নির্বাচনে উল্লেখযোগ্য সাফল্য পেয়েছে।

দলীয় নেতাদের দাবি অনুযায়ী, জামায়াতের সমর্থক সংখ্যা প্রায় ২ কোটি এবং নিবন্ধিত ‘রুকন’ বা সদস্য রয়েছেন প্রায় ২ লাখ ৫০ হাজার। বিশ্লেষকদের মতে, এবারের নির্বাচন কেবল একটি ভোটযুদ্ধ নয়—এটি জামায়াতের জন্য জাতীয় গ্রহণযোগ্যতা অর্জনের এক কঠিন পরীক্ষাও বটে। ১২ ফেব্রুয়ারির রায়ই নির্ধারণ করবে, দীর্ঘদিন বিতর্কের কেন্দ্রে থাকা এই দলটি তাদের সাংগঠনিক শক্তিকে রাষ্ট্রীয় বৈধতায় রূপ দিতে পারবে কি না।

বিজ্ঞাপন